Welcome to my Blog

Friday, 5 July 2013

রবীন্দ্রনৃত্য/Robindranitya

রবীন্দ্রনৃত্য
               প্রাচীন ভারতীয় নৃত্যশাস্ত্র গ্রন্থে নাচকে দু-ভাগে ভাগ করা হয়েছে, একটিকে বলা হয়েছে 'নৃত্য ', অপরটিকে 'নৃত্ত '। ছন্দময় দেহভঙ্গির সুষমার সঙ্গে যখন নানা রসের গানের অভিনয় যুক্ত হয়, তখন তাকে বলে 'নৃত্য ', আর 'নৃত্ত ' হল অভিনয়বিহীন ছন্দময় দেহভঙ্গি । এই দুটি ধারার নাচ ভারতের সর্বত্রই প্রচলিত । 'নৃত্য ' ধর্মী নাচের প্রকাশ দেখি কেরলের কথাকলি, তামিলনাড়ুর ভরতনাট্যম, অন্ধ্রপ্রদেশের কুচ্চিপুড়ি, কর্ণাটকের যক্ষগণ, উড়িষ্যার ওড়িশি,পশ্চিম ভারতের কথ্থক ও মণিপুরের মহারাস নৃত্যে । এগুলি পুরোপুরি পেশাদার নাচ । এর জন্য নানা ভাবে অর্থ ব্যয় হয় । প্রয়োজন হয় গুরুর সাহায্য, অভিনয়ের শিক্ষা নিতে হয় । এছাড়া প্রয়োজন হয সাজানো-গোছানো মণ্ডপ, মঞ্চপ্রাঙ্গন, তা সে মন্দিরেই হোক, শহরেই হোক বা গ্রামেই হোক ।

                   'নৃত্য ' পর্যায়ের নাচে যে সর্বত্রই শাস্ত্রানুযায়ী একই রীতিতে গঠিত তা নয় । অভিনয় রীতির বৈচিত্র এতেও দেখা য়ায় । ভরতনাট্যম, কথাকলি, কুচ্চিপুড়িতে দেহের সব অঙ্গের সাহায্যে,শাস্ত্রিয় ধারার অনুসরণে, গানের সঙ্গে, নানা ছন্দে যেভাবে অভিনয় করতে হয়, মণিপুরি রাস নৃত্য, কথ্থক নৃত্য এবং ওড়িশি নাচের রীতি তা থেকে ভিন্ন । তাছাড়া বিভিন্ন প্রদেশের লোকনাট্যের গানের সঙ্গে অভিনয় হয় সহজ সরল অঙ্গভঙ্গিতে । অভিনয় বিহীন ছন্দবদ্ধ নাচকে নৃত্যশাস্ত্র বলেছে 'নৃত্ত '। স্বতন্ত্রভাবে এইসব নাচ শেখবার কোনো ব্যবস্থা নেই । উৎসবে, পরবে শিশুরা বড়োদের সঙ্গে নাচে যোগদান করে, বড়োদের নাচের অনুকরণ করতে করতে নাচ শিখে ফেলে । সাজপোশাখে বিশেষ বৈচিত্র নেই, গ্রামবাসীদের প্রতিদিনের ব্যবহৃত পরিচ্ছদই এখানে অলংকৃত হয় ।

                 ভারতের 'নৃত্য ' ও 'নৃত্ত ' দুই ধরনের নাচের পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ বিশেষ ধরনের নৃত্য প্রচলন করেণ । শান্তিনিকেতনের নৃত্যে মণিপুরি রাস-নৃত্যের অনুরূপ অভিনয় যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনই স্থান পেয়েছিল বাংলার ও ভারতীয় বিভিন্ন প্রকৃতির লোকনৃত্যের নানা ঢং । গানের ভাব ও রসের সঙ্গে দুই নৃত্যধারাকে সাজিয়ে, প্রয়োজনমতো এক করে নিয়েছেন । রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে যখন দলবদ্ধ নাচ হয়েছে, তখন তার সঙ্গে অভিনয়ের কথা না ভেবে দলবদ্ধ লোকনৃত্যের আদর্শের আঙ্গিকেই তাকে তৈরি করেছেন । তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হল শান্তিনিকেতনের 'বৃক্ষরোপণ ' ও 'বসন্তোৎসব ' -এর 'মরুবিজয়ের কেতন উড়াও ' এবং 'ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল ' গান দুটি । এর সঙ্গে যে নাচ প্রচলিত, সেটি অনেক ভেবেচিন্তে, ভারতের দলবদ্ধ লোকনৃত্যের আদর্শকে সামনে রেখে রচনা করা হয়েছিল । ধ্রপদি নৃত্য যথা ভরতনাট্যম, কথাকলি, মণিপুরি, কথ্থক ও ওড়িশি নাচ যেমন সুশৃঙ্খল নৃত্যপদ্ধতিতে গাঁথা । সেরূপ কোনো বাঁধা নিয়মে সুনিদিষ্ট নয় শান্তিনিকেতনের নৃত্যধারা । সুতরাং একে অন্যান্য ধ্রুপদি নৃত্যশৈলীর মতো শ্রেণিনদ্ধ করা কখনোই সম্ভব নয় । রবীন্দ্রনাথের গান ও নৃত্যনাট্যের গানের সঙ্গে যে আঙ্গিকে নৃত্যাভিনয় হয়েছে তা ছিল সর্বদাই পরিবর্তনশীল । কোনোপ্রকার নিদিষ্ট নৃত্যধারা এর থেকে গড়ে ওঠেনি । প্রতিবারেই ভিন্ন  ভিন্ন নৃত্যভঙ্গির সাহায্যে, পরীক্ষানিরীক্ষা করে গানের সঙ্গে উৎকৃষ্ট অভিনয়ের জন্য তাকে তৈরি করে নিয়েছেন। এ হল চলমান মিশ্র নৃত্যধারার দ্বারা নৃত্যাভিনয় ।        

No comments:

Post a Comment

Thanks for your comments. Please visit again.